আমার দরিদ্র জীবন ও অনলাইন জীবনী
আমার দরিদ্র জীবন ও অনলাইন জীবনী
সারারাত কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালবেলা আসতাম বাসায়। থাকতাম নগর খাঁনপুর শ্যামসুন্দর শাহের বাড়িতে। (এরমধ্যে দাদাও এসে পড়ল নগর খাঁনপুরে। দাদা কিল্লার পুল সংলগ্ন ফাইন টেক্সটাইল মিলে কাজ নিয়ে কাজ করা শুরু করে। আমি প্রতিদিন রাতে দাদার সাথে তাঁতের কাজ শিখতে যেতাম। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁতের কাজ আমার আয়ত্তে চলে আসে। তখন রিকশা চালানো ছেড়ে মিলে তাঁতের কাজ করা শুরু করি।) সেখানে-ই ঘটে গেল আমার জীবনের ভালো লাগার একটা পর্ব।
শ্যামসুন্দর মহাশয়ের বাসায়-ই থাকতো এক মেয়ে, ও-ই আমার জীবনের প্রথম ভালো লাগার ভালোবাসা। (তখন সবেমাত্র টেক্সটাইল মিলে কাজ শিখে আমি কাজ করা শুরু করেছিলাম, কিল্লারপুল ফাইন টেক্সটাইল মিলে। সার্ভিস হয়েছে মাত্র ১৮/১৯ মাস। আমার সাথে একজন হেলপার ছিল, নাম ছিল কানাই লাল শাহা। একসময় ফাইন টেক্সটাইল মিলের কাজটা কানাইকে বুঝিয়ে দিয়ে আমি ফতুল্লা কাঠেরপুল ওয়েল টেক্সটাইল মিলে চলে যাই।) সেই ভালো লাগার দায় দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ওকে নিজ হাতে অন্যজনের হাতে তুলে দিতে হয়েছিল।
এর কিছুদিন পরে অবিবাহিত থাকা আমার এক বোনের বিবাহ দিয়েছি এই নগর খাঁনপুরে-ই। তাও নগর খাঁনপুর গ্রামবাসীর সহযোগীতায় বিবাহ সম্পূর্ণ হয়।
এরপর ১৯৮৪ সালে ফাইন টেক্সটাইল মিলের একজন শ্রমিকের বাড়িতে গিয়ে আরেক মেয়ের প্রেমে পড়ে ১৯৮৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই। সেই শ্রমিকের বাড়ি ছিল বিক্রমপুর তাল-তলা সুবচনীতে। ১৯৮৯ সালে একটি মেয়ে সন্তানের জনক হই। ১৯৯০ সালে আমার মা’ পরলোকগমন করেন। ১৯৯১ সালে পুত্র-সন্তানের জনক, এক মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে ভালোভাবেই দিন যাচ্ছিল।
২০০৭ সালে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি গোপালগঞ্জে। ২০১১ সালে আমার ছেলে-টা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেও পরলোকগমন করে। মৃত্যু-কালে ছেলের বয়স হয়েছিল ১৮/১৯ বছর। আমার ছেলে-টা ছিল একগুঁয়ে, যা বলতো তাই করতো। যা চাইতো তাই তাকে দিতে হতো। মৃত্যুর ৪/৫ মাস আগে ওর মায়ের কাছ থেকে ১০০০ টাকা নিয়ে ঢাকা বসুন্ধরা সিটিতে গিয়ে তখনকার নোকিয়া C3 একটা মোবাইল ফোন কিনে নিয়ে আসে।
ছেলের সেই রেখে যাওয়া নোকিয়া C3 মোবাইল দিয়েই আমার এই তথ্যপ্রযুক্তির অনলাইনে প্রবেশ। প্রথমে ফেসবুক, পরে গুগল প্লাস, টুইটার ও ইউটিউব। একসময় Al Bangla Newspaper নামে একটা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে বিডিনিউজের খবর পড়তাম।
অনলাইনে বহু সাইটে ঘুরতে-ঘুরতে ২০১৫ সালের বিডিনিউজ২৪ ডটকম ব্লগে প্রবেশ করি। ব্লগের লেখাগুলো ছিল আমার কাছে খুবই প্রিয়। লেখা পড়ে আমি কেবল ভাবতাম, আমি যদি লিখতে পারতাম! এসব ভাবতে-ভাবতে একদিন আমি ব্লগ ডট বিডিনিউজ২৪ ডটকমে নিবন্ধন করে ফেলি ৩ মার্চ ২০১৫ ইং তারিখে। কিন্তু হায়! প্রোফাইলে ছবি দিতে পারছিলাম না, আর নোকিয়া C3 মোবাইলে বাংলা লিখতেও পারছি না। মনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই যাচ্ছে, এখন আমার কিচ্ছুই ভালো লাগছে না।
তবু পথ আমি ছাড়ছি না, আমি ব্লগে লিখবো-ই। ব্লগে আমার প্রথম লেখাটা লিখেছিলাম ইংরেজিতে, শিরোনাম দিয়েছিলাম "I am also a human"(আমিও মানুষ)। অনেকদিন পর দেখি ব্লগ সংকলক পোস্টের শিরোনাম বাংলায় লেখার জন্য বলছে। কিন্তু তা কী করে সম্ভব! নোকিয়া মোবাইল দিয়ে তো বাংলা লিখাই যায় না।
একদিন এক বন্ধুর Symphony 85 মোবাইলে বিডিনিউজ ব্লগে লগইন করে শিরোনামটা বাংলায় লিখে দিই। পোস্টের লেখাও বাংলায় ছিল কি না তা মনে নেই। সেই লেখা প্রকাশ হওয়ার বহুদিন পর আর ব্লগে লগইন করিনি, সময় আর মোবাইলের কারণে।
প্রায় ৭/৮ মাস পর আমি নতুন একটা Symphony অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল কিনে ব্লগে লগইন করি, দেখি আমার সেই লেখায় চার-পাঁচটি মন্তব্য জমা হয়ে আছে। লেখার শিরোনাম আর পোস্টের লেখাও বাংলায়। মন্তব্যের উত্তরে জবাব দিতেই আমার বিডিনিউজ ব্লগে লেখা শুরু।
লিখতাম নারায়ণগঞ্জ শহরের নাগরিক সমস্যা নিয়ে। লিখতাম নগরের যানজট, পূজা-পার্বণ, এলাকার ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় উৎসবের বিবরণ, জানিয়ে দিতাম এলাকার সংবাদ। লিখতাম শীতলক্ষ্যা নদীর বিষাক্ত কেমিক্যালের নির্গত পানি নিয়ে। আবেদন জানাতাম শীতলক্ষ্যাকে বাঁচানোর, কারণ শীতলক্ষ্যা বাঁচলে আমরা বাঁচবো।
সেসব লেখাগুলো কোনো একসময় বিডিনিউজ ব্লগ কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এর মধ্যে ঘনিয়ে এলো ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আয়োজন হলো ‘নগর নাব্য-মেয়র সমীপেষু ২০১৭’ বই প্রকাশের।
সবাই যার যার লেখা জমা দিতে লাগল, আমি কিছু জমা দিইনি। বরং সহ-লেখকদের লেখা প্রস্তাবনায় দিয়েছি। আমার লেখার প্রস্তাবনা দিয়েছে আমাকে ভালোবাসে যারা।
এরপর ১৬ ফেব্রুয়ারি ধানমণ্ডির ড্যাফোডিল টাওয়ারে এক জাঁকজমক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র জনাব সাঈদ খোকন। উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য কমিশনারসহ আরও অনেক সম্মানিত ব্যক্তি।
সেই অনুষ্ঠানে সেরা লেখক সম্মাননা দেওয়া হয় আমাকে। আমি কৃতজ্ঞ বিডিনিউজ২৪ ব্লগ কর্তৃপক্ষের কাছে। আমি কৃতজ্ঞ পাঠক, সহ-লেখক ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে।
সবার অনুপ্রেরণা আর ভালোবাসায়ই আমি লিখতে পেরেছি আমার শহরবাসীর সমস্যা, তুলে ধরতে পেরেছি নগরের নানা অসঙ্গতি। ভবিষ্যতে যেন আরও লিখতে পারি নাগরিক জীবন ও বাস্তবতার গল্প — সেই আশীর্বাদ কামনা করি।
লেখার আরও অনেক কিছু ছিল, লিখলাম না — কারণ লেখাটি অনেক বড় হয়ে গেছে। আমি আমার জীবন নিয়ে এই সোনেলায় লিখলাম এই কারণে যে, যদি আর কখনো লিখতে না পারি! অন্তত কেউ যেন জানে একজন দরিদ্র মানুষ কীভাবে অনলাইন জীবনের অংশ হয়েছিল।
– শেষ করি সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করে।
✍ লেখক পরিচিতি:
নিতাই বাবু — একজন ব্লগার, লেখক এবং সমাজ-সচেতন কলমচি। ২০১৫ সাল থেকে বিডিনিউজ২৪ ব্লগে লিখছেন নারায়ণগঞ্জ শহর, নাগরিক সমস্যা ও নদী-পরিবেশ বিষয়ক নানা লেখা। পেশাগত জীবনের চেয়ে লেখালেখিই তাঁর আত্মার অভিব্যক্তি।
📌 ব্লগ শেয়ার লিংক:
🙏 পাঠকদের অনুরোধ:
আমার এই লেখাটি যদি আপনার মনে ছুঁয়ে যায়, অনুগ্রহ করে একটি ছোট মন্তব্য করুন। আপনার শেয়ার এক নতুন পাঠককে পৌঁছাতে পারে আমার গল্প।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
nitaibabunitaibabu@gmail.com