আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি: স্বাধীনতা দেখেছি
🕊️ আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি: স্বাধীনতা দেখেছি!
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তখন আমার বয়স মাত্র আট বছর। শিশুমনে তখনকার ভয়, আতঙ্ক আর গর্ব—সব মিশে এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে আছে আজও। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। বয়স কম হলেও বুঝতাম অনেক কিছু। চোখের সামনে দেখতাম কেমন করে আমাদের গ্রামে হঠাৎ হঠাৎ ছুটে আসে আতঙ্ক আর মৃত্যুভয়।
আমার মা—এক অসাধারণ সাহসিনী—সন্ধ্যা নামার আগেই আমার তিন বোনকে মাটির ঘরের পেছনের সুপারি বাগানে খুঁড়ে রাখা গর্তে লুকিয়ে রাখতেন। পুরো রাত তারা সেখানেই কাটাতো, ঠান্ডা, অন্ধকার আর আতঙ্কের মধ্যে। কাকডাকা ভোরে মা গিয়ে আবার সেই গর্ত থেকে টেনে তুলতেন, যেন একটু প্রাণ ফিরে পেত তারা।
আমার বড় জেঠা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি পুলিশ সদস্য। তাঁর সাহসী চরিত্র এবং স্থানীয়দের প্রতি সহমর্মিতা ছিল অনুকরণীয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে আসতেন। জেঠার সঙ্গে বসতেন, চা খেতেন, আলোচনা করতেন। ছোট্ট আমি তখন চুপিচুপি গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা স্টেনগান কিংবা রাইফেলের পাশে দাঁড়াতাম। সেগুলো স্পর্শ করতাম খুব ধীরে, যেন সাহস আর ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখছি।
তারপর এলো সেই অবিস্মরণীয় দিন—১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। আমাদের বাড়ির পাশের কাঁচা রাস্তায় রাজাকারদের হাত বেঁধে একে একে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বজরা রেলস্টেশনের দিকে। হাজারো মানুষের মধ্যে আমি একজন ছোট্ট ছেলে—হঠাৎ বুঝে গেলাম, স্বাধীনতা কী! মনে হচ্ছিল, আকাশ যেন নতুন আলোয় ভেসে গেছে। আর আমার মায়ের চোখে সেই প্রথম আনন্দের জল—যেটা ছিল বিজয়ের জল।
রাস্তাঘাটে তখন স্লোগানের গর্জন—আর উল্লাসে মেতে উঠেছিল। কেউ লাফিয়ে উঠছিল, কেউ কেঁদেওছিল খুশিতে। সেই মুহূর্তে আমাদের কষ্ট, রাতভর আতঙ্কে কাটানো রাতগুলো, গর্তে লুকিয়ে থাকা বোনেরা—সবই মুছে গেল বিজয়ের উত্তাপে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, দেশ স্বাধীন হবার পর আমাদের সেই গ্রামে আর বেশিদিন থাকা হয়নি। মুক্তির আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি দুর্বৃত্তদের উপদ্রবে। একসময় ডাকাতদের আতঙ্কে রাত কাটতো চোখে ঘুম না এনে। যাদের বিরুদ্ধে লড়েছিলাম একাত্তরে, যুদ্ধের পরে তাদের রূপ পাল্টে এল সমাজে—দখলদার, দুর্বৃত্ত, লুটেরা হয়ে।
আমার মা, জেঠা, আমরা সবাই অনেক কষ্টে সিদ্ধান্ত নেই—আর থাকা যাবে না। বড় দুঃখে, বড় কষ্টে সেই পবিত্র ভিটেমাটি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে হয়। পালিয়ে এসে ঠাঁই নিই নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন লক্ষ্মণখোলা গ্রাম সংলগ্ন আদর্শ কটন মিল এলাকায়।
নতুন পরিবেশ, নতুন সংগ্রাম, কিন্তু বুকের ভিতর তখনও জ্বলছে স্বাধীনতার সেই উজ্জ্বল আগুন।
তবুও আমি গর্বিত—
আমি স্বাধীনতা দেখেছি,
আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি।
আমার নাম হয়তো কোথাও লেখা থাকবে না ইতিহাসের পাতায়,
কিন্তু আমি গর্ব করে বলতে পারি—
আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। আমি স্বাধীনতা দেখেছি।
|
নিতাই বাবু
পুরস্কারপ্রাপ্ত নাগরিক সাংবাদিক – ২০১৭। লেখালেখির শুরু শৈশবে, এখনো চলছে।
🔗 আমার আরও ব্লগ: |

ভালো লাগার একটা সাইট।
উত্তরমুছুনফলো আর মন্তব্য করে পাশে থাকলে ধন্য হবো, দাদা ধন্যবাদ জানাচ্ছি!
মুছুন